ভূমিকা
আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় বান্দাদের উপরে কিছু জিনিস ফরয করেছেন, যা পরিত্যাগ করা জায়েয নয়, কিছু সীমা বেঁধে দিয়েছেন, যা অতিক্রম করা বৈধ নয় এবং কিছু জিনিস হারাম করেছেন, যার ধারে কাছে যাওয়াও ঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন-
مَا أَحَلَّ اللهُ فِىْ كِتَابِهِ فَهُوَ حَلاَلٌ وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَافِيَةٌ فَاقْبَلُوْا مِنَ اللهِ الْعَافِيَةَ، فَإِنَّ اللهَ لَمْ يَكُنْ نَسِيًّا. ثُمَّ تَلاَ هَذِهِ الآيَةَ (وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا)-
‘আল্লাহ তা‘আলা তার কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল, যা হারাম করেছেন তা হারাম, আর যে বিষয়ে তিনি নীরব থেকেছেন তা ক্ষমা। সুতরাং তোমরা আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমাকে গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বিস্মৃত হন না। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন, ‘তোমার প্রতিপালক বিস্মৃত হন না’ (মারিয়াম ১৯/৬৪)।[1]
আর এই হারাম সমূহই আল্লাহ তা‘আলার সীমারেখা। আল্লাহ বলেন, تِلْكَ حُدُودُ اللهِ فَلاَ تَقْرَبُوهَا ‘এসব আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা এগুলির নিকটেও যেয়ো না’ (বাক্বারাহ ১৮৭)।
আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘনকারী ও হারাম অবলম্বনকারীদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ভীতি প্রদর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন,
وَمَن يَعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِداً فِيْهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُّهِيْنٌ-
‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশের অবাধ্যতা করে এবং তাঁর সীমারেখাসমূহ লংঘন করে আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে চিরস্থায়ী হবে। আর তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি’ (নিসা ১৪)।
এজন্যেই হারাম থেকে বিরত থাকা ফরয। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
مَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ فَاجْتَنِبُوهُ وَمَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَافْعَلُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ-
‘আমি তোমাদেরকে যা কিছু নিষেধ করি তোমরা সেসব থেকে বিরত থাক। আর যা কিছু আদেশ করি তা যথাসাধ্য পালন কর’।[2]
লক্ষ্যণীয় যে, প্রবৃত্তিপূজারী, দুর্বলমনা ও স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী কিছু লোক যখন এক সঙ্গে কিছু হারামের কথা শুনতে পায় তখন অাঁতকে ওঠে এবং বিরক্তির সুরে বলে, ‘সবই তো হারাম হয়ে গেল। তোমরা তো দেখছি আমাদের জন্য হারাম ছাড়া কিছুই বাকী রাখলে না। তোমরা আমাদের জীবনটাকে সংকীর্ণ করে ফেললে, মনটাকে বিষিয়ে দিলে! জীবনটা একেবারে মাটি হয়ে গেল। কোন কিছুর সাধ-আহলাদই আমরা ভোগ করতে পারলাম না। শুধু হারাম হারাম ফৎওয়া দেয়া ছাড়া তোমাদের দেখছি আর কোন কাজ নেই। অথচ আল্লাহর দ্বীন সহজ-সরল। তিনি নিজেও ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর শরী‘আতের গন্ডিও ব্যাপকতর। সুতরাং হারাম এত সংখ্যক হ’তে পারে না’।
এদের জবাবে আমরা বলব, ‘আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা আদেশ করতে পারেন। তাঁর আদেশকে খন্ডন করার কেউ নেই। তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। সুতরাং তিনি যা ইচ্ছা হালাল করেছেন এবং যা ইচ্ছা হারাম করেছেন। তিনি পূত-পবিত্র। আল্লাহর দাস হিসাবে আমাদের নীতি হবে তাঁর আদেশের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়া। কেননা তাঁর দেয়া বিধানাবলী জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ইনছাফ মুতাবেকই প্রকাশ পেয়েছে। সেগুলি নিরর্থক ও খেলনার বস্ত্ত নয়। যেমন তিনি বলেছেন, وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقاً وَّعَدْلاً لاَّ مُبَدِّلِ لِكَلِمَاتِهِ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ ‘তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ হ’ল। তাঁর বাণীসমূহকে পরিবর্তনকারী কেউ নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (আন‘আম ১১৫)।
যে নিয়মের ভিত্তিতে হালাল-হারাম নির্ণিত হয়েছে আল্লাহ তা‘আলা তাও আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَآئِثَ ‘তিনি পবিত্র বস্ত্তকে তাদের জন্য হালাল এবং অপবিত্র বস্ত্তকে হারাম করেন’ (আ‘রাফ ১৫৭)।
সুতরাং যা পবিত্র তা হালাল এবং যা অপবিত্র তা হারাম। কোন কিছু হালাল ও হারাম করার অধিকার একমাত্র আল্লাহরই। কোন মানুষ নিজের জন্য তা দাবী করলে কিংবা কেউ তা অন্যের জন্য সাব্যস্ত করলে সে হবে একজন বড় কাফির ও মুসলিম উম্মাহ বহির্ভূত ব্যক্তি। আল্লাহ বলেন, أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوْا لَهُم مِّنَ الدِّيْنِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللهُ- ‘তবে কি তাদের এমন সব উপাস্য রয়েছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন সব বিধান দিয়েছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি’ (শূরা ২১)।
কুরআন-হাদীছে পারদর্শী আলেমগণ ব্যতীত হালাল-হারাম সম্পর্কে কথা বলার অধিকার অন্য কারো নেই। যে ব্যক্তি না জেনে হালাল-হারাম সম্পর্কে কথা বলে আল-কুরআনে তার সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন-
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلاَلٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللهِ الْكَذِبَ-
‘তোমাদের জিহবায় মিথ্যা উচ্চারিত হয় বলে তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপের মানসে বল না যে, এটা হালাল, ওটা হারাম’ (নাহল ১১৬)।
যেসব বস্ত্ত অখন্ডনীয়ভাবে হারাম তা কুরআন ও হাদীছে উল্লেখ আছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন-
قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلاَّ تُشْرِكُواْ بِهِ شَيْئاً وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً وَلاَ تَقْتُلُواْ أَوْلاَدَكُم مِّنْ إمْلاَقٍ-
‘আপনি বলুন, এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তা পড়ে শুনাই। তোমরা তার সঙ্গে কাউকে শরীক করো না, মাতা-পিতার সাথে সদাচরণ করবে আর দারিদ্রে্যর কারণে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না’ (আন‘আম ১৫১)।
অনুরূপভাবে হাদীছেও বহু হারাম জিনিসের বিবরণ এসেছে। যেমন- রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন- إِنَّ اللهَ حَرَّمَ بَيْعَ الْخَمْرِ وَالْمَيْتَةِ وَالْخِنْزِيرِ وَالأَصْنَامِ ‘আল্লাহ তা‘আলা মদ, মৃত প্রাণী, শূকর ও মূর্তি কেনা-বেচা হারাম করেছেন’।[3]
অপর হাদীছে এসেছে, إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ إِذَا حَرَّمَ شَيْئاً حَرَّمَ ثَمَنَهُ ‘আল্লাহ যখন কোন কিছু হারাম করেন তখন তার মূল্য তথা কেনা-বেচাও হারাম করে দেন’।[4]
কোন কোন আয়াতে কখনো একটি বিশেষ শ্রেণীর হারামের আলোচনা দেখতে পাওয়া যায়। যেমন হারাম খাদ্যদ্রব্য প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন,
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيْرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوْذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيْحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلاَّ مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوْا بِالْأَزْلاَمِ-
‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের গোশত, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে যবেহকৃত প্রাণী, গলা টিপে হত্যাকৃত প্রাণী, পাথরের আঘাতে নিহত প্রাণী, উপর থেকে নীচে পড়ে গিয়ে মৃত প্রাণী, শিং এর আঘাতে মৃত প্রাণী, হিংস্র প্রাণীর ভক্ষিত প্রাণী। অবশ্য (উল্লেখিত ক্ষেত্রগুলিতে যে সব হালাল প্রাণীকে) তোমরা যবেহ করতে সক্ষম হও সেগুলি হারাম হবে না। আর (তোমাদের জন্য হারাম) সেইসব প্রাণী যেগুলি পূজার বেদীমূলে যবেহ করা হয় এবং ভাগ্য নির্ণায়ক তীরের সাহায্যে যে গোশত তোমরা বণ্টন কর’ (মায়েদাহ ৩)।
হারাম বিবাহ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالاَتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللاَّتِيْ أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهَاتُ نِسَآئِكُمْ-
‘তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতৃকুল, কন্যাকুল, ভগ্নিকুল, ফুফুকুল, খালাকুল, ভ্রাতুষ্পুত্রীকুল, ভগ্নিকন্যাকুল, স্তন্যদাত্রী মাতৃকুল, স্তন্যপান সম্পর্কিত ভগ্নীকুল ও শাশুড়ীদেরকে’ (নিসা ২৩)।
উপার্জন বিষয়ক হারাম সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন- أَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ‘আল্লাহ তা‘আলা কেনা-বেচা হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন’ (বাক্বারাহ ২৭৫)।
বস্ত্ততঃ মানুষের প্রতি পরম দয়ালু আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য সংখ্যা ও শ্রেণীগতভাবে এত পবিত্র জিনিস হালাল করেছেন যে, তা গুণে শেষ করা সম্ভব নয়। এ কারণেই তিনি হালাল জিনিসগুলির বিস্তারিত বিবরণ দেননি। কিন্তু হারামের সংখ্যা যেহেতু সীমিত এবং সেগুলি জানার পর মানুষ যেন তা থেকে বিরত থাকতে পারে সেজন্য তিনি উহার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলেন, وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلاَّ مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ ‘তিনি তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তার বিস্তারিত বিবরণ তোমাদেরকে দান করেছেন। তবে তোমরা যে হারামটা বাধ্য হয়ে বা ঠেকায় পড়ে করে ফেল তা ক্ষমার্হ’ (আন‘আম ১১৯)।
হারামকে এভাবে বিস্তারিত পেশের কথা বললেও হালালকে কিন্তু সংক্ষেপে সাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُواْ مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلاَلاً طَيِّباً ‘হে মানবকুল! তোমরা যমীনের বুকে যা কিছু হালাল ও উৎকৃষ্ট সেগুলি খাও’ (বাক্বারাহ ১৬৮)।
হারামের দলীল সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত সব জিনিসের মূল হুকুম হালাল হওয়াটা মহান আল্লাহর পরম করুণা। এটা মহান আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর বান্দাদের উপর সহজীকরণের নিদর্শন স্বরূপ। সুতরাং তাঁর আনুগত্য প্রকাশ, প্রশংসা ও শুকরিয়া জ্ঞাপন করা আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য।
কিন্তু পূর্বোল্লেখিত ঐসব লোক যখন তাদের সামনে হারামগুলি বিস্তারিত দেখতে পায় তখন শরী‘আতের বিধি-বিধানের ব্যাপারে তাদের মন সংকীর্ণতায় ভোগে। এটা তাদের ঈমানী দুর্বলতা ও শরী‘আত সম্পর্কে অনুধাবন শক্তির স্বল্পতার ফসল।
আসলে তারা কি চায় যে, হালালের শ্রেণীবিভাগগুলিও তাদের সামনে এক এক করে গণনা করা হোক যাতে তারা দ্বীন যে একটা সহজ বিষয় তা জেনে আত্মতৃপ্ত হতে পারে?
তারা কি চায় যে, নানা শ্রেণীর পবিত্র জিনিসগুলি তাদের সামনে এক এক করে তুলে ধরা হোক, যাতে তারা নিশ্চিত হতে পারে যে, শরী‘আত তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে দেয়নি। তারা কি চায় যে এভাবে বলা হোক?-
-উট, গরু, ছাগল, খরগোশ, হরিণ, পাহাড়ী ছাগল, মুরগী, কবুতর, হাঁস, রাজহাঁস, উটপাখি ইত্যাকার যবেহকৃত প্রাণীর গোশত হালাল।
-মৃত পঙ্গপাল ও মাছ হালাল।
-শাক-সবজি, ফলমূল, সকল দানাশস্য ও উপকারী ফল-ফুল হালাল। পানি, দুধ, মধু, তেল ও শিরকা হালাল। লবণ, মরিচ ও মসলা হালাল।
-লোহা, বালু, খোয়া, প্লাস্টিক, কাঁচ ও রাবার ইত্যাদি ব্যবহার হালাল।
-খাট, চেয়ার, টেবিল, সোফা, তৈজসপত্র, আসবাবপত্র ইত্যাদি ব্যবহার হালাল।
-জীবজন্তু, মোটরগাড়ী, রেলগাড়ী, নৌকা, জাহাজ ও বিমানে আরোহণ হালাল।
-এয়ারকন্ডিশন, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, পানি শুকানোর যন্ত্র, পেষণ যন্ত্র, আটা খামির করার যন্ত্র, কিমা তৈরীর যন্ত্র, ব্লেন্ডার মেশিন, সবরকমের ডাক্তারী, ইঞ্জিনিয়ারিং যন্ত্রপাতি, জাহাজ তৈরী, নির্মাণ বিষয়ক যন্ত্রপাতি, হিসাব রক্ষণ, পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার এবং পানি, পেট্রোল, খনিজদ্রব্য উত্তোলন ও শোধন, মুদ্রণ যন্ত্রপাতি ইত্যাদি হালাল।
-সূতী, কাতান, পশম, নাইলন, পলেস্টার ও বৈধ চামড়ার তৈরী বস্ত্র হালাল।
-বিবাহ, বেচা-কেনা, যিম্মাদারী, চেক, ড্রাফট, মনিঅর্ডার, ইজারা বা ভাড়া প্রদান হালাল।
-বিভিন্ন পেশা যেমন কাঠমিস্ত্রীগিরি, কর্মকারগিরি, যন্ত্রপাতি মেরামত, ছাগপালের রাখালী ইত্যাদি হালাল।
এভাবে গুনলে আর বর্ণনা করলে পাঠকের কি মনে হয় আমরা হালালের ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করতে পারব? তাহলে এসব লোকের কি হ’ল যে, তারা যে কোন কথাই বুঝতে চায় না?
দ্বীন যে সহজ তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবুও একথা বলে যারা সব কিছুই হালাল প্রমাণ করতে চায় তাদের কথা সত্য, কিন্তু উদ্দেশ্য খারাপ। কেননা দ্বীনের মধ্যে কোন কিছু মানুষের মর্যি মাফিক সহজ হয় না। তা কেবল শরী‘আতে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে সেভাবেই নির্ধারিত হবে। অপর দিকে ‘দ্বীন সহজ’ এরূপ বাতিল দলীল দিয়ে হারাম কাজ করা আর শরী‘আতের অবকাশমূলক দিক গ্রহণ করার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। অবকাশমূলক কাজের উদাহরণ হ’ল সফরে দু’ওয়াক্তের ছালাত একত্রে পড়া, ক্বছর করা, সফরে ছিয়াম ভঙ্গ করা, মুক্বীমের জন্য একদিন এক রাত এবং মুসাফিরের জন্য তিনদিন তিন রাত মোযার উপর মাসেহ করা, পানি ব্যবহারের অসুবিধা থাকলে তায়াম্মুম করা, অসুস্থ হ’লে কিংবা বৃষ্টি নামলে দু’ওয়াক্তের ছালাত একত্রে পড়া, বিবাহের প্রস্তাবদাতার জন্য গায়ের মাহরাম মহিলাকে দেখা, শপথের কাফফারায় দাস মুক্তি, আহার করানো, বস্ত্র দান, ছিয়াম পালনের যে কোন একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করা (মায়েদা ৮৯), নিরূপায় হলে মৃত প্রাণীর গোশত ভক্ষণ করা ইত্যাদি।
মোটকথা, শরী‘আতে যখন হারাম আছে তখন সকল মুসলমানের জন্যই উহার মধ্যে যে গূঢ় রহস্য বা তত্ত্ব লুকিয়ে আছে তা জানা দরকার। যেমন-
(১) আল্লাহ তা‘আলা হারাম দ্বারা তার বান্দাদের পরীক্ষা করেন। তারা এ সম্পর্কে কেমন আচরণ করে তা তিনি লক্ষ্য করেন।
(২) কে জান্নাতবাসী হবে আর কে জাহান্নামবাসী হবে হারামের মাধ্যমে তা নির্ণয় করা চলে। যারা জাহান্নামী তারা সর্বদা প্রবৃত্তির পূজায় মগ্ন থাকে, যা দিয়ে জাহান্নামকে ঘিরে রাখা হয়েছে। আর যারা জান্নাতী তারা দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে, যে দুঃখ-কষ্ট দিয়ে জান্নাতকে বেষ্টন করে রাখা হয়েছে। এ পরীক্ষা না থাকলে বাধ্য হ’তে অবাধ্যকে পৃথক করা যেত না।
(৩) যারা ঈমানদার তারা হারাম ত্যাগজনিত কষ্ট সহ্য করাকে সাক্ষাৎ পুণ্য এবং আল্লাহ তা‘আলার যে কোন নির্দেশ পালনকে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উপায় বলে মনে করে। ফলে কষ্ট স্বীকার করা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যারা কপট ও মুনাফিক্ব তারা কষ্ট সহ্য করাকে যন্ত্রণা, বেদনা ও বঞ্চনা বলে মনে করে। ফলে ইসলামের পথে চলা তাদের জন্য কঠিন এবং সৎ কাজ সম্পাদন ও আনুগত্য স্বীকার করা ততধিক কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
(৪) একজন সৎ লোক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনার্থে হারাম পরিহার করলে বিনিময়ে তার চেয়ে যে উত্তম কিছু পাওয়া যায় তা ভালমত অনুধাবন করতে পারে। এভাবে সে তার মনোরাজ্যে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে।
আলোচ্য পুস্তকের মধ্যে সম্মানিত পাঠক শরী‘আতে হারাম বলে গণ্য এমন কিছু সংখ্যক নিষিদ্ধ বিষয়ের বিবরণ পাবেন কুরআন-সুন্নাহ থেকে সেগুলো হারাম হওয়ার দলীলসহ। এসব হারাম এমনই যা আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বহুসংখ্যক মুসলমান নির্দ্বিধায় তা হরহামেশা করে চলেছে। আমরা কেবল মানুষের কল্যাণ কামনার্থে তাদের সামনে এগুলি তুলে ধরেছি অতি সংক্ষেপে।
[1]. হাকেম, দারাকুৎনী; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২২৫৬।[2]. মুসলিম, হা/১৩৩৭ ‘ফাযায়েল’ অধ্যায়।
[3]. আবুদাঊদ হা/৩৪৮৬, সনদ ছহীহ।
[4]. দারাকুৎনী, ইবনু হিববান হা/৪৯৩৮, সনদ ছহীহ।
শিরক
আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা যে কোন বিচারে সবচেয়ে বড় হারাম ও মহাপাপ। আবু বাকরা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে-
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلىَّ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ (ثلاثا). قُلْنَا بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ . قَالَ : الإِشْرَاكُ بِاللهِ-
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে বৃহত্তম কবীরা গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করব না (তিনবার)’? ছাহাবীগণ বললেন, ‘অবশ্যই বলবেন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শিরক করা ...’।[1]
শিরক ব্যতীত প্রত্যেক পাপের ক্ষেত্রেই আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা প্রাপ্তির একটি সম্ভাবনা আছে। তওবাই উহার একমাত্র প্রতিকার। আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গে কৃত শিরককে ক্ষমা করবেন না। তাছাড়া যত গুনাহ আছে তা তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন’ (নিসা ৪৮)।
এমন বড় শিরক রয়েছে যা দ্বীন ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এরূপ শিরককারী ব্যক্তি যদি ঐ অবস্থায় মারা যায় তাহলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।
দুঃখজনক হ’লেও সত্য, অনেক মুসলিম দেশেই আজ শিরকের প্রাদুর্ভাব ছিড়িয়ে পড়ছে।[1]. বুখারী হা/৫৯৭৬; মুসলিম হা/৮৭।কবরপূজা
মৃত ওলী-আউলিয়া মানুষের অভাব পূরণ করেন, বিপদাপদ দূর করেন, তাঁদের অসীলায় সাহায্য প্রার্থনা ও ফরিয়াদ করা যাবে ইত্যাকার কথা বিশ্বাস করা শিরক। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَقَضَى رَبُّكَ أَلاَّ تَعْبُدُواْ إِلاَّ إِيَّاهُ ‘তোমার প্রভু চূড়ান্ত ফয়ছালা দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করবে না’ (বনী ইসরাঈল ২৩)। অনুরূপভাবে শাফা‘আতের নিমিত্তে কিংবা বালা-মুছীবত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে মৃত নবী-ওলী প্রমুখের নিকট দো‘আ করাও শিরক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
أَمَّنْ يُّجِيْبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوْءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ أَإِلَهٌ مَّعَ اللهِ-
‘বল তো কে নিঃসহায়ের আহবানে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে আহবান জানায় এবং দুঃখ-কষ্ট দূর করেন আর পৃথিবীতে তোমাদেরকে পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন? আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোন ইলাহ আছে’? (নামল ৬২)।
অনেকেই উঠতে, বসতে, বিপদাপদে পীর-মুরশিদ, ওলী-আউলিয়া, নবী-রাসূল ইত্যাকার মহাজনদের নাম নেয়া অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে। যখনই তারা কোন বিপদে বা সংকটে পড়ে তখনই বলে ইয়া মুহাম্মাদ, ইয়া আলী, ইয়া হুসাইন, ইয়া বাদাভী, ইয়া জীলানী, ইয়া শাযেলী, ইয়া রিফাঈ। কেউ যদি ডাকে আইদারুসকে তো অন্যজন ডাকে মা যায়নাবকে, আরেকজন ডাকে ইবনু উলওয়ানকে। অথচ আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِيْنَ تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ ‘আল্লাহ ব্যতীত আর যাদেরকে তোমরা ডাক তারা তোমাদেরই মত দাস’ (আ‘রাফ ১৯৪)।
কিছু কবরপূজারী আছে যারা কবরকে তাওয়াফ করে, কবরগাত্র চুম্বন করে, কবরে হাত বুলায়, লাল শালুতে মাথা ঠেকিয়ে পড়ে থাকে, কবরের মাটি তাদের গা-গতরে মাখে, কবরকে সিজদা করে, উহার সামনে মিনতিভরে দাঁড়ায়, নিজের উদ্দেশ্য ও অভাবের কথা তুলে ধরে। সুস্থতা কামনা করে, সন্তান চায় অথবা প্রয়োজনাদি পূরণ কামনা করে। অনেক সময় কবরে শায়িত ব্যক্তিকে ডেকে বলে, ‘বাবা হুযূর, আমি আপনার হুযূরে অনেক দূর থেকে হাযির হয়েছি। কাজেই আপনি আমাকে নিরাশ করবেন না’। অথচ আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُوْ مِنْ دُوْنِ اللهِ مَنْ لاَّ يَسْتَجِيْبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُوْنَ-
‘তাদের থেকে অধিকতর দিকভ্রান্ত আর কে আছে, যারা আল্লাহ ব্যতীত এমন সব উপাস্যকে ডাকে যারা ক্বিয়ামত পর্যন্তও তাদের ডাকে সাড়া দেবে না। অধিকন্তু তারা ওদের ডাকাডাকি সম্বন্ধে কোন খবর রাখে না’ (আহক্বাফ ৫)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে তার সমকক্ষ বা অংশীদার মনে করে তার নিকট দো‘আ প্রার্থনা করে, আর ঐ অবস্থায় মারা যায় সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[1]
কবরপূজারীরা অনেকেই কবরের পাশে মাথা মুন্ডন করে।[2] তারা অনেকে ‘মাযার যিয়ারতের নিয়মাবলী’ নামের বই সাথে রাখে। এসব মাযার বলতে তারা ওলী-আউলিয়া বা সাধু-সন্তুদের কবরকে বুঝিয়ে থাকে। অনেকের আবার বিশ্বাস, ওলী-আউলিয়াগণ সৃষ্টিজগতের উপর প্রভাব খাটিয়ে থাকেন, তাঁরা ক্ষতিও করেন; উপকারও করেন। অথচ আল্লাহ বলেন,
وَإِنْ يَّمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلاَ كَاشِفَ لَهُ إِلاَّ هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلاَ رَآدَّ لِفَضْلِهِ-
‘আর যদি আপনার প্রতিপালক আপনাকে কোন অমঙ্গলের স্পর্শে আনেন, তবে তিনি ব্যতীত অন্য কেউ উহার বিমোচক নেই। আর যদি তিনি আপনার কোন মঙ্গল করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহকে তিনি ব্যতীত রুখবারও কেউ নেই’ (ইউনুস ১০৭)।
একইভাবে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে মানত করাও শিরক। মাযার ও দরগার নামে মোমবাতি, আগরবাতি মানত করে অনেকেই এরূপ শিরকে জড়িয়ে পড়ছে।[1]. বুখারী হা/৪৪৯৭।
[2]. আমাদের দেশে শিশুদের মাথার চুল মাযারের নামে মানত করার নিয়ম চালু আছে। নির্দিষ্ট দিনে মাযারে গিয়ে এই চুল মুন্ডন করা হয়, যা শিরকের অন্তর্ভুক্ত-অনুবাদক।
গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা
আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে পশু যবেহ ও বলি দেয়া শিরকে আকবর বা বড় শিরক-এর অন্যতম। আল্লাহ বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘আপনার প্রভুর উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় করুন এবং যবেহ করুন’ (কাওছার ২)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে যবেহ করে তার উপর আল্লাহর লা‘নত’।[1]
যবেহ-এর সঙ্গে জড়িত হারাম দু’প্রকার। যথাঃ (১) আললাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে যবেহ করা। যেমন- দেবতার কৃপা লাভের জন্য (২) আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নাম নিয়ে যবেহ করা। উভয় প্রকার যবেহকৃত পশুর গোশত খাওয়া হারাম।
জাহেলী আরবে জিনের উদ্দেশ্যে প্রাণী যবেহ-এর রেওয়ায ছিল, যা আজও বিভিন্ন আঙ্গিকে কোন কোন মুসলিম দেশে চালু আছে। সে সময়ে কেউ বাড়ী ক্রয় করলে কিংবা তৈরী করলে অথবা কূপ খনন করলে তাদের উপরে জিনের উপদ্রব হতে পারে ভেবে পূর্বাহ্নেই তারা সেখানে বা দরজার চৌকাঠের উপরে প্রাণী যবেহ করত। এরূপ যবেহ সম্পূর্ণরূপে হারাম।[2][1]. মুসলিম হা/১৯৭৮; মিশকাত হা/৪০৭০।
[2]. আমাদের দেশে এক শ্রেণীর মানুষ সন্তান লাভ, রোগমুক্তি, মুশকিল আসান, মামলা-মোকদ্দমায় জয়লাভ কিংবা অন্যবিধ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য দরগা, মাযার ও কুদরতী মসজিদে (?) গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগী, চাউল, মিষ্টান্ন, টাকা-পয়সা প্রভৃতি দিয়ে থাকে। তারা বিশ্বাস করে যে, এসব জায়গায় এগুলি দেওয়ার ফলে দরগাহ ও মাযারের সাথে সংশ্লিষ্ট মৃত মহাজন বা কুদরতী মসজিদ তাদের সব সমস্যা দূর করে দেবে। এরূপ বিশ্বাস সরাসরি শিরক। দেবতার নামে নরবলী দেওয়ার প্রথাও নানা ধর্মে অতীতকাল থেকেই চালু আছে। কেউ তা করলে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হবে- অনুবাদক।
হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল মনে করা
কোন কিছু হালাল কিংবা হারাম করার একচ্ছত্র মালিক আল্লাহ রাববুল আলামীন। কোন মানুষ আল্লাহর দেওয়া হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল করার অধিকার রাখে না। তবুও অনধিকার চর্চা বশে মানুষ কর্তৃক আল্লাহকৃত হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল করণের বহু দৃষ্টান্ত দেখা যায়। নিঃসন্দেহে এটি একটি হারাম কাজ। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো হালাল-হারাম করার অধিকার আছে বলে বিশ্বাস করাও শিরক। জাহেলী তথা অনৈসলামী আইন-কানূন দ্বারা পরিচালিত বিচারালয়ের নিকট সন্তুষ্ট চিত্তে, স্বেচ্ছায় ও বৈধ জ্ঞানে বিচার প্রার্থনা করা এবং এরূপ বিচার প্রার্থনার বৈধতা আছে বলে আক্বীদা পোষণ করা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে এই মারাত্মক শিরক প্রসঙ্গে বলেন,
اِتَّخَذُواْ أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِّنْ دُوْنِ اللهِ-
‘আল্লাহর পরিবর্তে তারা তাদের আলেম ও সাধু-দরবেশদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে’ (তওবা ৩১)।
আদী বিন হাতেম (রাঃ) আল্লাহর নবীকে এ আয়াত পাঠ করতে শুনে বলেছিলেন, إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ ‘ওরা তো তাদের ইবাদত করে না’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছিলেন, وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوهُ ‘তা বটে। কিন্তু আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারা ওদেরকে তা হালাল করে দিলে ওরা তা হালালই মনে করে। একইভাবে আল্লাহ যা হালাল করেছেন তারা ওদেরকে তা হারাম করে দিলে ওরা তা হারামই মনে করে। এটাই তাদের ইবাদত করা’।[1]
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মুশরিকদের আচরণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
وَلاَ يُحَرِّمُوْنَ مَا حَرَّمَ اللهُ وَرَسُولُهُ وَلاَ يَدِيْنُوْنَ دِيْنَ الْحَقِّ-
‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তারা তাকে হারাম গণ্য করে না এবং সত্য দ্বীনকে তাদের দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করে না’ (তওবা ২৯)।
অন্যত্র তিনি বলেন,
قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَّا أَنْزَلَ اللهُ لَكُم مِّن رِّزْقٍ فَجَعَلْتُمْ مِّنْهُ حَرَاماً وَحَلاَلاً قُلْ اللهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى اللهِ تَفْتَرُونَ-
‘আপনি বলুন, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে যে রূযী দান করেছেন, তন্মধ্যে তোমরা যে সেগুলির কতক হারাম ও কতক হালাল করে নিয়েছ, তা কি তোমরা ভেবে দেখেছ? আপনি বলুন, আল্লাহ কি তোমাদেরকে এতদ্বিষয়ে অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর নামে মনগড়া কথা বলছ’ (ইউনুস ৫৯)।[2]
[1]. তিরমিযী হা/৩০৯৫, সনদ হাসান।[2]. অধুনা অনেক মুসলিম দেশে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি মানব রচিত মতবাদের স্বার্থে কুরআন-সুন্নাহকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে আইন পরিষদে এমন সব আইন পাশ করা হচ্ছে, যার ফলে আল্লাহর দেয়া বহু হারাম হালাল হয়ে যাচ্ছে এবং বহু হালাল হারাম হয়ে যাচ্ছে। যেমন মদ-জুয়া, বেশ্যাবৃত্তি, লটারী, সূদ-ঘুষ ইত্যাদিকে লাইসেন্সের মাধ্যমে বৈধ করা হয়েছে। অথচ ইসলামে এগুলি কঠোরভাবে হারাম। অপরদিকে শরী‘আহ মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা, ইসলামী ফৌজদারী ও দেওয়ানী আইন, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ ইত্যাদি হালাল ও যরূরী বিষয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সকল আইন প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজনের অধিকাংশই মুসলিম বলে নিজেদেরকে দাবী করে। যাদের উপর এসব আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে তারাও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম। তারা কেউ ইসলাম বিরোধী এসব আইনের প্রতিবাদ করে না; বরং স্বাচ্ছন্দ্যে এগুলি গ্রহণ করে নিচ্ছে। প্রশ্ন দাঁড়ায়, উপরোক্ত বর্ণনার আলোকে আমরা কি মুসলিম? -অনুবাদক।
জাদু ও ভাগ্যগণনা
জাদু ও ভাগ্যগণনা কুফর ও শিরকের পর্যায়ভুক্ত হারাম। জাদু তো পরিষ্কার কুফর এবং সাতটি ধ্বংসাত্মক কবীরা গুনাহর অন্যতম। জাদু শুধু ক্ষতিই করে, কোন উপকার করে না। জাদু শিক্ষা করা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلاَ يَنفَعُهُمْ ‘তারা এমন জিনিস (জাদু) শিক্ষা করে, যা তাদের অপকারই করে, কোন উপকার করে না’ (বাক্বারাহ ১০২)।
তিনি আরো বলেন, وَلاَ يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى ‘জাদুকর যেভাবেই আসুক না কেন সে সফল হবে না’ (ত্বোয়াহা ৬৯)।
জাদু চর্চাকারী কাফের। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَـكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُواْ يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولاَ إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلاَ تَكْفُرْ-
‘সুলায়মান কুফরী করেননি। কিন্তু কুফরী করেছে শয়তানেরা। তারা মানুষকে শিক্ষা দেয় জাদু এবং বাবেলে হারূত-মারূত নামের দু’জন ফেরেশতার উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল তা। ঐ ফেরেশতাদ্বয় কাউকে একথা না বলে কিছু শিক্ষা দেয়নি যে, আমরা এক মহাপরীক্ষার জন্য। সুতরাং তুমি (জাদু শিখে) কুফরী করো না’ (বাক্বারাহ ১০২)।
ইসলামী বিধানে জাদুকরকে হত্যা করার কথা বলা হয়েছে। জাদুকরের উপার্জন অপবিত্র ও হারাম। জ্ঞানপাপী, অত্যাচারী ও দুর্বল ঈমানের লোকেরা অন্যের সঙ্গে শত্রুতা ও জিঘাংসা চরিতার্থ করার জন্য জাদুকরদের নিকটে যায়।
অনেকে আবার জাদুর ক্রিয়া দূর করার জন্য জাদুকরের শরণাপন্ন হয়। এজন্যে যাওয়াও হারাম। বরং তাদের উচিত ছিল আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া এবং আল্লাহর কালাম যেমন সূরা নাস, ফালাক্ব ইত্যাদি দিয়ে আরোগ্য লাভের চেষ্টা করা।
গণক ও ভবিষ্যদ্বক্তা উভয়েই আল্লাহ তা‘আলাকে অস্বীকারকারী কাফিরদের দলভুক্ত। কারণ তারা উভয়েই গায়েব বা অদৃশ্যের কথা জানার দাবী করে। অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।
অনেক সময় তারা সরলমনা লোকদের সম্পদ লুটে নেয়ার জন্য তাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে। এজন্য তারা বালুর উপর অাঁকি-বুঁুকি, চটা (বাটি বা থালা) চালান, হাতের তালুতে ফুঁক, চায়ের পেয়ালা, কাঁচের গুলী, আয়না ইত্যাদি উপকরণ ব্যবহার করে থাকে। এসব লোকের কথা একটা যদি সত্য হয় তো নিরানববইটাই হয় মিথ্যা। কিন্তু গাফিলরা এসব ধোঁকাবাজ-মিথ্যুকদের এক সত্যকেই হাযার সত্য গণ্য করে নিজেদের ভবিষ্যৎ ভাগ্য, বিয়ে-শাদী, ব্যবসা-বাণিজ্যের শুভাশুভ তাদের নিকট জানতে চায়। তারা হারানো জিনিস কোথায় কিভাবে পাওয়া যাবে তা জানার জন্য তাদের নিকটে ছুটে যায়। যারা তাদের কাছে গিয়ে তাদের কথা বিশ্বাস করে, তারা কাফের এবং ইসলাম থেকে বহির্ভূত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
مَنْ أَتَى كَاهِناً أَوْ عَرَّافاً فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ-
‘যে ব্যক্তি গণক কিংবা ভবিষ্যদ্বক্তার নিকটে যায় এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে, সে নিশ্চিতভাবেই মুহাম্মাদের উপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করে’।[1]
যে ব্যক্তি তারা গায়েব জানে না বলে বিশ্বাস করে কিন্তু অভিজ্ঞতা কিংবা অনুরূপ কিছু অর্জনের জন্য তাদের নিকটে যায় সে কাফির হবে না বটে, তবে তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَىْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلاَةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
‘যে ব্যক্তি কোন ভবিষ্যদ্বক্তার নিকটে যায় এবং তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে, তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না’।[2] তবে তাকে ছালাত অবশ্যই আদায় করতে হবে এবং বিশেষভাবে তওবা করতে হবে।[1]. আহমাদ হা/৯৫৩২; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৩৮৭।
[2]. মুসলিম হা/২২৩০; মিশকাত হা/৪৫৯৫।
রাশিফল ও মানব জীবনের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব সম্পর্কিত বিশ্বাস
যায়েদ বিন খালিদ আল-জুহানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হুদায়বিয়াতে এক রাতে আকাশে একটি চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। সেদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফজর ছালাত শেষে লোকদের দিকে ফিরে বসেন এবং বলেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন তা কি তোমরা জান’? তারা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন, ‘আমার কিছু বান্দা আমার উপর বিশ্বাসী হয়ে এবং কিছু বান্দা অবিশ্বাসী হয়ে ভোরে ওঠে। যারা বলে, আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার প্রতি বিশ্বাসী ও গ্রহ-নক্ষত্রে অবিশ্বাসী। আর যারা বলে, অমুক অমুক গ্রহের প্রভাবে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার প্রতি অবিশ্বাসী ও গ্রহ-নক্ষত্রে বিশ্বাসী’।[1]
গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টি হওয়ার কথা বিশ্বাস করা যেমন কুফরী, তেমনি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রাশিফলের আশ্রয় নেওয়াও কুফরী। যে ব্যক্তি রাশিফলের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবের কথা বিশ্বাস করবে, সে সরাসরি মুশরিক হয়ে যাবে। পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তকে রাশিফলের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে সেগুলি পাঠ করা শিরক। তবে বিশ্বাস না করে কেবল মানসিক সান্ত্বনা অর্জনের জন্য পড়লে তাতে শিরক হবে না বটে, কিন্তু সে গোনাহগার হবে। কেননা শিরকী কোন কিছু পাঠ করে সান্ত্বনা লাভ করা বৈধ নয়। তাছাড়া শয়তান কর্তৃক তার মনে উক্ত বিশ্বাস জন্মিয়ে দিতে কতক্ষণ? তখন এ পড়াই তার শিরকের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াবে।